তর্কের যে নিয়ম প্রশ্নহীনভাবেই গ্রাহ্য তার বাইরের তর্ক

অনন্ত জলিলের ইংরেজি নিয়া যারা হাসতেছেন

ঈদের পরে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে নায়ক এম এ জলিল ঢাকাই চলচ্চিত্রের নায়কদের সম্পর্কে মানুষজনের অবজ্ঞা বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।

ওই অনুষ্ঠানে অনন্ত বলেন, কিছুদিন আগে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি তাকে দেখিয়ে সঙ্গীদের বলেন, “ওই দ্যাখ বাংলা ছবির হিরো’; তখন ওই ব্যক্তির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আর ইউ পোম (ফ্রম) গানা?”, “ইউ থিং বাংলা ছবি হিরো মিনস দে আর আনএজুকেটেড?”, “ইউ আর লিভিং ইন বাংলাদেশ, ওকে, ম্যান ইউ হ্যাভ টু রেস্পেক্টিং বাংলাদেশ, বিকজ ইউ আর ইটিং ফুড ফ্রম বাংলাদেশ”।

ওই অনুষ্ঠানে অনন্তের এসব সংলাপ ‘ইউটিউব’ এবং ‘ফেইসবুক’সহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা হাস্যরসের সৃষ্টি করে। বহু মানুষ এই ভিডিওটি ফেইসবুকে শেয়ার করেন। বিশেষত তরুণ-তরুণীরা চলচ্চিত্রের মতোই টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও নায়ক অনন্তের ইংরেজি উচ্চারণ এবং বাচনভঙ্গি নিয়ে কৌতুকে মেতে ওঠে।

 – ‘নায়ক অনন্তের’ সংলাপে বুয়েট ভিসিকে ব্যঙ্গ’ (বুয়েট ব্যঙ্গ নিয়ে  bdnews24.com-এর  ২০১২ সালের নিউজ)

 

বাংলাদেশের শিক্ষিত বাবা-মায়ের শিক্ষিত সন্তানেরা ইংরেজি ও বাংলা শুদ্ধ উচ্চারণে বলতে চায় সে প্রায় অনেক দিন হইয়া গেল।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো উপনিবেশিত মানসিকতার শিক্ষকরাও এই রকমই করতে শিখাইয়া আসছেন। ভাষার শুদ্ধতা উচ্চ শ্রেণীর রুচিবোধ দিয়া গইড়া ওঠে। পুরানা পয়সাঅলারা ভাষার শুদ্ধতা দিয়া নতুন পয়সাঅলাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক দূরত্ব বজায় রাখতে বহুত সক্ষম হয়। সো ভাষার শুদ্ধতা বড়লোক ও বড়লোকদের ধামাধরাদের একটা জরুরি আইটেম।

অভিনেতা অনন্ত জলিলের উচ্চারণ নিয়া ঢাকাই মিডল ক্লাস ব্যঙ্গে গুলজার হইয়া উঠছে। তার ইংরেজি বলার চেষ্টারে, বিশেষত তথাকথিত ভুল উচ্চারণে ইংরেজি বলার চেষ্টারে হীনম্মন্যতা প্রসূত আচরণ ধরা হইছে। যে, বাঙালি যে স্মার্ট হইতে চায় এইটা থিকা যে তারা ভুল সঠিক না ভাইবাই ইংরেজি বলে তা নাকি হীনম্মন্যতা প্রসূত আচরণ।

সো সে যাতে আর এই রকম চেষ্টা না করে তা এই মধ্যবিত্তকুলের চাহিদা! বলিহারি যাই!

‘স্মার্ট হইতে চাই তাই ইংরাজি বলি’—এরে যদি হীনম্মন্যতার মাপকাঠি দিয়া ধরতে হয় তাইলে বলতে হয়, যারা ভুল-সঠিক বিবেচনা না কইরা ইংরেজি বলার চেষ্টা করে তারা বরং যারা সঠিক ইংরেজি সঠিক উচ্চারণেই বলতে হবে’র চেষ্টা করে তাদের চাইতে কম হীনম্মন্য। সো এই সরল সূত্র মোতাবেক, জলিলরে নিয়া যারা হাসে তারা জলিলের চাইতে অধিক হীনম্মন্য। তাদের হীনম্মন্যতা সঠিক ইংরেজি ও সঠিক উচ্চারণ সংক্রান্ত।

আমি অবশ্য এরে হীনম্মন্যতা বলব না। এইটা উপনিবেশিত মনের সন্তুষ্টির জায়গা।

ভালো ইংরেজি ভালো ভাবে বলবার সন্তুষ্টি।

প্রভুর সমান টাকা-পয়সা হইছে, এখন ভাষাটাও যে রপ্ত হইছে সেই সন্তুষ্টি। যারা প্রভুর ভাষা প্রভুর উচ্চারণে বলতে পারে না তাদেরকে প্রভুর হইয়া ব্যঙ্গ করার কর্তব্য তখন কান্ধে আইসা দাঁড়ায়। কারণ ওই ব্যঙ্গ করার মধ্য দিয়াই সকলরে জানান দেওন যায় যে দাস এখন প্রভু হইতে পারছে।

বুয়েট পড়ুয়ারা যে ইংরেজি উচ্চারণ অধিক ইংরেজদের কাছাকাছি বলতে পারে তাতে প্রভুদের কাছের লোকই তারা হইয়া গেছে বলতে হবে। জলিল কেন ইংরেজি কামান দাগাইতে গেল, এই আপত্তি যাদের তাদের কাছে জিজ্ঞাসা, ঢাকাই বাংলা ফিল্মের বর্তমান রক্ষাকর্তা অনন্ত জলিলরে আপনারা কী কারণে নিজেদের শ্রেণীর ধইরা নিছিলেন। সে তো আপনাদের হীনম্মন্যতা দিয়া নিজেরে তৈরি করে নাই।

২/৯/২০১২

 

Facebook Comments

Leave a Reply