তর্কের যে নিয়ম প্রশ্নহীনভাবেই গ্রাহ্য তার বাইরের তর্ক

গ্রাম ছাইড়া আসা সংস্কৃতিসেবীগো লইয়া অল্প আলাপ

আমার ধারণা এইখানকার বুদ্ধিজীবীদের চাইতেও মিডিয়ার নিয়ন্ত্রকরা বড় সমস্যা। এঁরা বেশির ভাগ দরিদ্র ঘর আর গ্রাম থিকা আসা। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অন্য ফকিরদের–যথা আমারদের–জায়গা দিতে চান না। অদ্ভুত ব্যাপার, আর্ট ইন্সটিটিউটে ঢাকা শহরে জন্ম এই রকম পোলামাইয়া কম পাওয়া যায়। কারণ শিক্ষকরা জয়নুলের কাল থনে গ্রাম থিকা আসতেছেন। এনারা ইতর সাম্যবাদী প্রক্রিয়ায় ঢাকা শহরের আধুনিক দীক্ষায় দীক্ষিতদের দূরে সরাইয়া রাখছেন। সেই জিনিসেরই প্রাবল্য এখন মিডিয়ায়। হয়তো খুঁজলে দেখা যাবে জসীম উদদীন আর জয়নুলই দায়ী আমাদের পিছাইয়া পড়া সংস্কৃতিচর্চার জন্য। ওনাগো নিজেগো কাজ ভালো। কিন্তু যেই পলিটিক্স ওনারা কইরা গেছেন তা খারাপ। সুলতানরেই তো ঢুকতে দেন নাই জয়নুল, কামরুল এঁরা। নাকি ভুল বললাম?

২.
এইখানে যেই পেশা বা ভাবের লোকের যেমন হওয়ার কথা তারা তেমন তেমন না। কম্যুনিস্টগো দেখেন, মনে হবে ছাত্রশিবিরের মার্ক্সবাদী শাখা। বাউলরা ইয়াং বাঙালিয়ানাঅলাদের ধামাধরা। নারীবাদীরা–বেগম রোকেয়া এক এক জন। উচ্চ ভাব, উচ্চ বংশ, অদৃশ্য ধর্মভাব দিয়া নারীত্বরে পুরুষত্ব দিয়া গোছাইয়া রাখছে।

সকলই আশরাফ-আতরাফ ভেদ। ওইটারে কেবলই ঈর্ষা হিসাবে দেখতে চাই না। গ্রামসমাজের শহর দখল, তাদের আশরাফ হইয়া উঠতে চাওয়ারে শ্রেণিযুদ্ধই মনে হবে বাইরে থিকা। আমি মনে করি এই শ্রেণী সমাজ বদলের সবচেয়ে বড় বাধা। যখন আরবান উচ্চ ক্লাস, মধ্য ক্লাস, লোয়ার মিডল ক্লাস, গ্রামের লোকজন, গানের লোকজন, মাইজভাণ্ডারীরা ভাষা বদল-এ রেডিক্যাল অবস্থান নিতেছে দেখবেন গ্রাম থিকা আসা (যাদের হৃদয় রাজধানীময়) বড়লোক হইয়া ওঠা সংস্কৃতিসেবীরা শুদ্ধতার সিন্দুকের উপ্রে বইসা বইসা কানতে লাগছে।

৩.
আমার আব্বা আম্মা দুইজনের বাড়ি কুমিল্লায়। গ্রামে। ওনারা ঢাকায় আসছিলেন প্রায় ৪৫/৫০ বছর হইল। আমি এই রকম বাপমা আর তাদের ছেলেমেয়েদের কথা বলতেছি–বা তাদের চেয়ে উচ্চ সাংস্কৃতিক যারা। আমি দেখছি এঁরাই (মানে আমরাই) ‘গ্রাম্য’ আর ‘গ্রামীণ’ এই দুই নাম ঠিক করি।

আমার নিজের কাছে কথিত ‘গ্রামীণ’ একটু শহরের ধামাধরা, কিন্তু খারাপ না। তবে ‘গ্রাম্য’রেই বেটার মনে হয়। এই গ্রাম্যরে ব্লক করতে গিয়া, লুকাইতে গিয়া গ্রাম থিকা আসা লোকরা শ্রেণিগত রুচিগত উচ্চভাবের অনুশীলন শুরু করে। বিলাই যেমন গু লুকায় ফেলায় এরাও অরিজিন লুকাইতে চায়। যেন তা খারাপ! তা থিকা অর্ধসত্যের জীবনযাপন চলতে থাকে। হয়ত, সেটলারের সংস্কৃতি এইটাই! ফলে কাল্পনিক গ্রামীণ এক গ্রাম নির্মাণ পর্ব চলতে থাকে মিডিয়ায়। যেই মিডিয়া তৈরি হইছে অসংখ্য গ্রাম থিকা আসা টাউট-বাটপারের দ্বারা।

৪.
সাংস্কৃতিক উত্তরণের ধারণাটাই প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা। প্রত্যেক সংস্কৃতিই যদি আপন নিয়মে পরিপূর্ণ হয় তাইলে উত্তরণের প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু কোনো শ্রেণী এই রকম মনে কইরা গণহীনম্মন্যতায় ভূগতে পারে। গ্রাম থিকা আওনের লগে লগে আমি গ্রামের সকল চিহ্ন মোছা শুরু করলাম এই রকম তো করে অনেকেই। গ্রাম্যতার সবচেয়ে বিরোধী কিন্তু শহরের আদি অধিবাসীরা না। বরং সেটলাররা।

৫.
মিডিয়ার টাউটামি কোনো আচরণ না। এইটা একটা অ্যাকশন। অ্যাকশনে আচরণ থাকতে পারে, আচরণটা সমালোচনার মইধ্যে পড়বে না, অ্যাকশনটা পড়বে।

গ্রাম থিকা শহরে আসলে শ্রেণী উত্তরণ ঘটতে পারে। কারণ ইনকামাদি তখন বাড়ে। কিন্তু শ্রেণী উত্তরণই সাংস্কৃতিক উত্তরণ তো না। তবে অন্যের সংস্কৃতি তো গ্রহণ করাই যায়। তা দোষের মনে করি না আমি। কিন্তু গ্রামের লোক শহরে আইসা যখন শহরের সংস্কৃতি গ্রহণ করে সেইটা পুরা গ্রহণ হয় না, কিছু অপাচ্য থাইকা যায়। আর অন্যের সংস্কৃতিরে পুরা গ্রহণ করা তো যায়ও না।

৬.
মিডিয়ার টাউটামিরে গ্রুপ বিহেভিয়ার ধরার বিপদ আছে। মলম পার্টিরা যখন চোখে মুখে মলম ডইলা সব হাতায় নেয় ওইটা যত না বিহেভিয়র প্যাটার্ন তার চেয়ে বেশি ওয়ার্ক প্যাটার্ন। তেমনি মিডিয়ার গ্রাম থিকা আসা কর্তুকামদের অস্তিত্ব রক্ষা ও জাহিরের ধরনটা কোনো বিহেভিয়র প্যাটার্ন না বরং ওইটাই ওনাদের কাজ করার ধরন। রাজনৈতিক ও নীতিগত অবস্থান। এইটারে বিহেভিয়ার প্যাটার্ন হিসাবে বিচার করতে গেলে আমি কেবলই রুচিগত বিচার করতেছি। বা প্রাণিবিদ্যার তরফ থিকা দেখতেছি। রাজনৈতিক বিচারের বাইরে থাইকা যায় তখন তারা। কারো বা কোনো শ্রেণীর আচরণ নিয়া আপত্তি কখনোই রুচিগত আপত্তির বেশি হইতে পারে না।

কোনো শ্রেণীর আচরণের প্যাটার্ন অনুসন্ধান সাম্প্রদায়িক কাজ। কিন্তু কোনো শ্রেণীর সাম্প্রদায়িক কর্মপদ্ধতির প্যাটার্ন অনুসন্ধান বিপ্লবী কাজ।

জানুয়ারি ২০০৯

 

2 Comments

Add Yours →

ভালই লাগতাসিল…
বুঝদে গিয়া আরো প্যাঁচাইয়া গেসি। কনফ্যুজড!

Leave a Reply