তর্কের যে নিয়ম প্রশ্নহীনভাবেই গ্রাহ্য তার বাইরের তর্ক

বেশির ভাগের নিজের নামটি বাপের আমলের–তা বদলানো হীনম্মন্যতা নয়!

ছেলেটার নাম রেখেছিলাম তিতু [তিতুমীর]; কিন্তু সে নিজেকে পরিচয় দিতে শুরু করে টিটো নামে। / আবুল মনসুর আহমদ

মাত্র এক লাইনে বাংগালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক হীনমন্যতার এত গভীরতর ব্যাখ্যা পাওয়া বিরল। / আলতাফ পারভেজ

আমাদের আধুনিকতার ইতিহাস মানেই কিন্তু এইটা ঘটনা। শামসুর রাহমান থেইকা ব্রাত্য রাইসু সবাই বুইঝা বা না বুইঝা হোক নামে মর্ডার্ন মুসলিম হইছেন। ব্যতিক্রম সলিমুল্লাহ খান, তিনি ‘সলিম উল্লাহ’ ছাইড়া ‘সলিমুল্লাহ’ হইছেন। / আলমগীর নিষাদ

আবুল মনসুর আহমদ  (১৮৯৮-১৯৭৯)
আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯)

আলমগীর, বাপের দেওয়া নাম ধারণ না করার মধ্যে মডার্নত্ব কিছু নাই। নাম কোনটা গ্রহণ করবেন তা আপনার নিজের ব্যাপার। আপনি মেবি বাপের দেওয়া নাম রক্ষা কইরা যাইতেছেন–এইটার মানে এই না যে ‘মডার্ন মুসলিম’ হন নাই। বরং মডার্ন অ-হীণম্মন্যতার স্মারক হিসাবে বাপের দেওয়া নাম হয়তো বহন করতেছেন আপনি।

আমি যদি ‘মডার্ন মুসলিম’ হইয়া থাকি–তা আমি হই নাই, হইতে চাইও নাই–তা নাম দিয়া না। নিজের নাম নিজের কাছে শ্রুতিমধুর হইলে নাম ধারণকারীর তা ভালো লাগতে পারে। নাম যেহেতু নিজেরই নিজরে বাপের না–তাই তা পছন্দের হইতে হয়। পছন্দ না হইলে বদলাইতে পারমু না তা তো নয় নিজ নাম। কীভাবে বদলাইতে হবে তার সাজেশন আপনার তরফে যা পাইলাম তা হইল শুদ্ধ ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে থাকতে হবে বদলাইন্না নামও। তিতু নাম রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী মোহাম্মদ বিযুক্ত আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের কাছে বৃহৎ ব্যাপার হইতে পারে। তার ছেলে মিশ্র সংস্কৃতিতে মিশতে গিয়া বা না গিয়া যদি টিটো নাম নেয় সেই নেওয়াটারে সহ্য করতে না পারাটা মনসুরের বরং সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতা।

যেহেতু মডার্ন মুসলিম হিসাবে আপনাদের এক সরলীকরণ–মোছলমানগন্ধী নাম হইলে হীনম্মন্যতার কিছু নাই–সুতরাং তা বদলাইলে সর্বদা হীনম্মন্যতার কারণে বদলায়। জগতে হীনম্মন্যতার বাইরেও বহু ব্যাপার রহিয়া গিয়াছে। শ্রুতিমধুরতার ধারণা, নান্দনিকতার ধারণা, নিজের নাম নিজে রাখনের ধারণা বাপের আমল দিয়া গইড়া ওঠে না সকলের। কেউ কেউ ভুল ভাবে হইলেও নিজের নান্দনিকতার ধারণা নিজের মাধ্যমে পাইতে চেষ্টা করে। এই বাংলায় যাদের বাপেরা গ্রামসি ইত্যাদি ভিন্ন সংস্কৃতি থিকা টুইকা নেওয়া নাম পোলাদের জন্যে বরাদ্দ করছিল বা করতে দিছিল সেই বাপবৃন্দও কোনো মডার্ন মুসলিম হইতে চাইয়া তা করছিল কি? আর সেই পোলারা যখন সেই অহীনম্মন্য ভিন্ন সাংস্কৃতিক নাম বহাল রাখে তখনই বা কোন মডার্নত্ব বেহাজির হয়?

যেই লোক তার নিজের ছেলের নাম আলমগীর কিংবা সলিমুল্লাহ রাখবে না সেই লোক নিজের নাম আলমগীর বা সলিমুল্লাহ না রাখলে অত খামোশ হইয়েন না যে খুব সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতা হইতেছে!

২.
‘সলিমউল্লাহ’ নাম ছাইড়া বাঙালি মোছলমান আতরাফ শ্রেণীতে সহজপ্রাপ্য ‘ছলিমউল্লাহ’ না নিয়া আশরাফ শ্রেণীতে বিকশিত নবাবের নাম ‘সলিমুল্লাহ’ গ্রহণ করাতে বেশ ব্যতিক্রম ঘটল! তাহা বেশক। আমি এমন গ্রহণরেও হীনম্মন্যতা বলব না। মিশ্র সাংস্কৃতিক সমাজে পর্যুদস্ত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর লোকেদের আপন সংস্কৃতি রক্ষার জন্যে সদস্যদের রুচি ও ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণের যে নৈতিক প্রপাগান্ডা তারে আমি হিটলারি বলতে পারি। সংখ্যায় কম বা বেশি হইলে যে হিটলারি ঘটে না তা তো না।

অন্যের ধর্ম গ্রহণ যে কারণে কেবল ধর্মীয় হীনম্মন্যতা নয় তেমনি আশরাফ শ্রেণীর নাম গ্রহণ মানেই আতরাফপনা বা হীনম্মন্যতা নয়। নবাব সলিমুল্লাহ ও বাদশাহ আলমগীরের নামের ঐতিহাসিক আশরাফ ধারাবাহিকতার–হিঃ হিঃ–জেয় হোক!

২১/৫/১৩

Flag Counter

Facebook Comments

6 Comments

Add Yours →

এ জ্বালায় আমার ডাকনামটিকেও (নলেজ) অনেকে ছদ্মনাম মনে করেন।কোন কোন দৈনিক সম্পাদক শেষ অংশটুকু কেটে দিয়ে আমার কলাম ছেপেছেন।
এতে দুঃখ পেলেও জনস্বার্থে প্রতিবাদ করি নি।

ফলে দুই নামে পত্রিকায় হাজির হচ্ছি।নলেজসহ ও নলেজ ছাড়া।

Leave a Reply