তর্কের যে নিয়ম প্রশ্নহীনভাবেই গ্রাহ্য তার বাইরের তর্ক

প্রমিত, অপ্রমিত, ফাইজলামি ও ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে কুতর্ক উইথ ফরহাদ মজহার, সাল ২০১৪ টু ২০১৮

প্রমিত ও অপ্রমিত ভাষা, সাহিত্য, ফাইজলামি, ভাবগাম্ভীর্য ইত্যাদি প্রসঙ্গে নিচের এই আলাপগুলি সাধিত হইছে ফেসবুকে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। এখানে সন্নিবেশিত হইল। আরো আলাপ অর তর্ক হইলে পরে যুক্ত হবে এখানে।

১. ফরহাদ মজহার (২৪ মার্চ ২০১৪) :

“আশির দশকে তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় যে পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে তার লক্ষণগুলো এই ধরণের লেখালিখির মধ্য দিয়ে হাজির হতে শুরু করেছে। এই ক্ষেত্রে আমার আপত্তি যদি কিছু থেকে থাকে সেটা হচ্ছে তরুণদের বড় একটি অংশ যারা প্রমিত ভাষার বিপরীতে লেখালিখি করেন তারা এই ভাষায় বিশ্বাস করেন না, যে কারনে ভাষাটির সম্ভাবনা এতে উদাম না হয়ে একটা ফাজিল বা ফাজলামির ব্যাপারে পর্যবসিত হয়।”

(কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি!, চিন্তা, ২৪ মার্চ ২০১৪)

ফরহাদ মজহার

২. ব্রাত্য রাইসু (৩১ মার্চ ২০১৪) :

এই ভাষায় অনেক কম লোক লেখতেছে সেইটাই এইটার সম্ভাবনা উদাম না হওয়ার কারণ, ফাইজলামি না।

ফাইজলামি যে কোনো ভাষায় সাধিত হইতে পারে, এইটা অপ্রমিত ভাষার সাধারণ গুণ না। চর্চার ক্ষেত্রে কে কোন জিনিস নিয়া আগাবে তা তার তার ব্যাপার।

কেউ অপ্রমিত ভাষায় লেখে তাই তার মধ্যে ফাইজলামি আছে এমন দেখতে পাওয়াটা পুলিশি দৃষ্টিপাত।

ফরহাদ ভাইরে অনুরোধ করব অপ্রমিত ভাষারে প্রমিতের যে অর্জন তার দিকে ঠেইলা দিবেন না। এই ভাষা যেহেতু নতুন দর্শন দেয় তা পুরাতন ভাবগাম্ভীর্যের কচকচিতে যাবে না।

এইটা কেবল নতুন ভাষা না নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও। তাতে ফাইজলামির মধ্য দিয়া গুরুতর কিছু পাইতে বা দিতে সমস্যা হওয়ার কথা না। বরং ফাইজলামি বা ভাষাটার স্বাভাবিক প্রকাশরে ব্যাহত করলে এই ভাষা প্রমিতের অনুবাদে পরিণত হবে।

ফাইজলামি প্রতিবন্ধক না। বরং এও এক সম্ভাবনা। প্রমিত-অপ্রমিত সব ভাষায় আরো আরো ফাইজলামি করতেই বরং আমি আহ্বান করব সবাইরে।

গম্ভীর বা সিরিয়াস ভঙ্গিই বরং ভাষার সম্ভাবনারে অভিনয়ের কারণে তথা দুর্বল প্রকাশভঙ্গির কারণে সীমিত করে।

বৈচিত্র সব ভাষায়ই আছে বা থাকে। ভাষা এই জন্যেই ভাষা যে তার ভাব বা ভঙ্গি একটি মাত্র নয়।

তা যেমন ফাইজলামি দিয়া প্রকাশিত হয়, ভাবগাম্ভীর্য দিয়াও হয়।

যেইখানে ফাইজলামির দরকার সেখানে ভাবগাম্ভীর্য হয়তো অধিকতর ফাইজলামিরই ব্যাপার। ‪

৩. ব্রাত্য রাইসু (১২ এপ্রিল ২০১৪) :

প্রমিতের অর্জন ভাবগাম্ভীর্য। নবীন এই প্রমিত ভাষা তৈরি হইছে এতদিনকার লোকমুখে চর্চিত অপ্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে কেতাবিপনা কইরা। এই কেতাবগিরি ভাবগাম্ভীর্যের সহায়তায় সাধিত হয়।

এই ভাষার দর্শন ফাজলামি না করা, নিষ্ঠায় মন রাখা।

ফাজলামি যেহেতু সীমিত থাকার সঙ্গে যায় না বা এরে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আধো আধো রাখা সম্ভব না সুতরাং প্রমিত রীতি ফাজলামিকে বরদাশত করে না।

তারও আগে, বিফোর দ্যাট, মুখের ভাষায় বা অপ্রমিতে যে ফাজলামির অবকাশ তা ছাটতে ছাটতেই প্রমিত ভাষারীতি গইড়া উঠছে।

ফাজলামিহীনতা বা সিরিয়াসনেস প্রতিষ্ঠাই প্রমিত ভাষার সমূহ অর্জন।

প্রমিতের এই দাপটের পরবর্তী কালে লিখিত রীতিতে যে অপ্রমিতের আগমন তা লঘুতার দর্শন দেয়।

অনেক বড় বিষয় বইলা দূরে সরাইয়া রাখার যে দর্শন তা প্রমিত ভাষা বা রীতির দর্শন।

অপ্রমিত ভাষা বা রীতি নিষ্ঠ হওয়া ছাড়াই, গভীর হওয়া ছাড়াই, তথাকথিত বড় বিষয়রে বড় হিসাবে পাত্তা না দিয়াই দর্শন জিনিসটারে অস্পষ্টতা ও অপরিচ্ছন্নতাসহ আলাপে আনার চেষ্টা করে।

ফলাফল বা লক্ষ্য বা সাধনা ছাড়াই অপ্রমিত ভাষা বা রীতি যে কোনো বিষয় পাড়তে পারে।

সঠিকতা, পরিচ্ছন্নতা, স্পষ্টতা অপ্রমিত ভাষার বা রীতির দর্শন নয়। সেইটা প্রমিতের, আনুষ্ঠানিকতার, সংঘের বা ছাত্র পড়ানোর দর্শন।

যদি সঠিকতা নাই তবে নিষ্ঠা কীসের!

৪. ফরহাদ মজহার (১২ এপ্রিল ২০১৪) :

প্রমিতের অর্জন ভাবগাম্ভীর্য। নবীন এই প্রমিত ভাষা তৈরি হইছে এতদিনকার লোকমুখে চর্চিত অপ্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে কেতাবিপনা কইরা। এই কেতাবিগিরি ভাবগাম্ভীর্যের সহায়তায় সাধিত হয়। — রাইসু

‘ফাইজলামি’ ভাষা বা সাহিত্য বিচারের কোন মানদণ্ড না। প্রমিত ভাষার অর্জন ‘ভাবগাম্ভীর্য’, এটা আপনার আবিষ্কার, যার কোন প্রামাণ্য ভিত্তি নাই। এই দাবি ছহি না। প্রমিত ভাষায় লিখলেই আপনার কাছে ‘ভাবগম্ভীর’ মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে না। প্রমিত ভাষাতেও ফাইজলামি সম্ভব, এটা আমরা হামেশাই করি। যাকে আমরা রম্য রচনা বলি, রসালো বা ফাজিল সাহিত্য – সেটা সাহিত্যের একটি ধরণ বা জেনার।

ভাবগম্ভীর লেখা আপনার কথিত ‘অপ্রমিত’ ভাষাতেও সম্ভব। এই মুহূর্তে আমার এবাদুর রহমানের লেখা মনে পড়ছে। আপনার সঙ্গে তর্ক করতে গিয়েই ওর লেখা আবার জোগাড় করেছি। পড়ছি। সিরিয়াস ও ভাবগম্ভীর লেখা। আপনার তত্ত্বের বিপরীতে এবাদুরকে দাঁড় করানো অবশ্যই সম্ভব। আরও দুই একজনের উদাহরণ দেওয়া যেতো, আমি অন্যদের লেখা জোগাড় করে নিয়ে দরকার হলে পড়ে আরও লিখব।

আপনি নিজেও কিছুদিন আগে ভাবগম্ভির গদ্য লিখেছিলেন, আমি ফোন করে আপনাকে ভূয়সি প্রশংসা করেছি। আপনি নিজেই প্রমাণ করেছেন অপ্রমিত ভাষায় ‘ভাবগম্ভীর’ সাহিত্য রচনা সম্ভব। অতএব সাহিত্য গম্ভির নাকি ফাজিল সেটা ভাষা দিয়ে বোঝা যাবে না, সেটা লেখকের ইচ্ছা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও স্টাইলের ওপর নির্ভরশীল। প্রমিত ভাষা যেমন ফাজিল হতে পারে, তেমনি আপনার কথিত ‘অপ্রমিত’ ভাষাও দারুন ভাবগম্ভীর হতে পারে।

আপনি আপনার অর্জনকে ‘ফাইজলামি’র দিকে নিতে চাইছেন, সেখানেই একে বদ্ধ রাখতে চান যাতে তার সম্ভাবনা নষ্ট হয়। তাই কি? এই চিন্তাটা ভুল ও বিপজ্জনক চিন্তা। সৃষ্টিশীল কাজকে তার নিজের মতো করে বিকশিত হতে দিন। কোন খাপে না ফেলাই ভালো।

অনেক তরুণ দেখছি তথাকথিত ‘অপ্রমিত’ ভাষায় ভাবগম্ভীর লেখা লিখবার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টা আমার খুব পছন্দ। এই ধরনের চেষ্টার মধ্যেই আমি ‘নিষ্ঠা’ দেখি। অর্থাৎ এই ভাষাতে আর কি পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যায় তারা তাতে নিষ্ঠাবান। আপনার ফাইজলামি তত্ত্বের বিপরীতে তাদের অর্জন দাঁড়িয়ে যেতে পারে। আপনি ফাইজলামি করতে করতে এক সময় ফুরিয়ে যান, আমরা অনেকেই তা চাই না। যা একদমই আমার কামনা না। আপনার ঐতিহাসিক অবদানকে স্বীকার করা যেমন সকলের কর্তব্য, ঠিক তেমনি এর সম্ভাবনার বিরুদ্ধে আপনার অহেতুক তৎপরতাকেও নিন্দা করা জরুরী। ফাইজলামি পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে আপনি আসলে আচরঙত ফাইজলামিকেই প্রতিষ্ঠা করছেন। এর সঙ্গে সাহিত্যের কোন সম্পর্ক নাই। বেয়াদপি সাহিত্যের গুণ না, সামাজিক হতে না পারার পেটিবুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত সুলভ বাহাদুরি।

আমার ভয় নিজে বাচ্চা পয়দা কইরা আপনি নিজেই তারে গলায় ছুরি দিয়া মেরে ফেলতে চান। আমি নিষ্ঠায় বিশ্বাসী। এই অপরাধ আপনাকে করতে দেওয়া যায় না। আমি চাই আপনি আপনার চর্চার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিন। সেটা ভাবগম্ভির হোল কি ফাজিল হোল সেটা নিয়া অযথা তর্ক ক্ষান্ত দিন।

ফাইজলামিকে যদি মানদণ্ড বানাইতে চান তাহলে কমলকুমার মজুমদারের ভাষাও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে ফাইজলামি। অর্থাৎ সাহিত্যের পুলিশদের কাছে যে ভাষা স্বাভাবিক/প্রমিত/স্টান্ডার্ড না। আপনার ফাইজলামি তত্ত্বের যদি কোন গুরুত্ব থাকে তা হচ্ছে সৃষ্টিশীল সাহিত্য চর্চা মাত্রই প্রচলিত, প্রমিত বা সাহিত্যের অধিপতি ধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, ভাংচুর করে, নতুন কিছু করতে পারুক বা না পারুক সব কিছুই ভেঙেচুরে ফেলতে চায়। এটা ফাজিলদের কাজ না, নিষ্ঠাবানদেরই কাজ, যারা সাহিত্যের রাজনৈতিক ও নান্দনিক হিম্মত সম্পর্কে ষোল আনা ওয়াকিবহাল । রাজনৈতিক ও নান্দনিক উভয় কারনেই আমি এইসকল বিপ্লবীদের পক্ষে।

আমি বলেছি, ‘অপ্রমিত’ বইলা গড়ে হরিবোল কিছু নাই; আপনি উত্তর দিলেন না। যে কোন নিষ্ঠাবান সাহিত্যিক প্রচলিত, প্রমিত বা অধিপতি ভাষাকে তার বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে সামনে হাজির দেখে, এর বিপরীতে তাকে দাঁড়াতে হয়; একদিকে সাহিত্যের প্রচলিত/অধিপতি/প্রমিত ধারা সাহিত্য চর্চার উপায়, ব্যাকরণ বা শর্ত হিসাবে সামাজিক ও ঐতিহাসিক সত্য হিসাবে তার সামনে হাজির থাকে, অন্যদিকে এই উপস্থিতি একই সঙ্গে এর ওপর তার নিজের ছাপ খচিত করে দেবার ক্ষেত্রে বাধা। অতএব ‘প্রমিত’ ভাষা বা সাহিত্যকে অবশ্যই প্রতিটি সাহিত্যিক বা ভাষার কারিগরকে গুরুত্ব দিতে হয়। এ ছাড়া চলে না। ওর সঙ্গে দ্বন্দ্ব/সংঘাত/সমন্বয়/সমঝোতা করেই প্রতিটি লেখককে তার নিজের কণ্ঠস্বর আবিষ্কারের সাধনা করতে হয়। এর বিকল্প নাই। এর মধ্যে মহৎ কিছু নাই। এটাই ঘটে।

ভাষা একদিকে সামাজিক, কিন্তু মানুষ মাত্রই ভাষাকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে। ঠিক একই ভাবে এই ব্যবহারের মধ্য দিয়েই কবি বা সাহিত্যিক নিজেকে ব্যক্ত করেন, তার স্বাতন্ত্র্য আমরা শনাক্ত করি।

‘প্রমিত রীতি ফাইজলামিকে বরদাশত করে না… প্রমিত ভাষার দর্শন ফাইজলামি না করা, নিষ্ঠায় মন রাখা’ – আপনার এই দাবি ঠিক না। ‘মুখের ভাষায় বা অপ্রমিতে যে ফাইজলামির অবকাশ তা ছাটতে ছাটতেই প্রমিত ভাষারীতি গইড়া উঠছে’ আপনার এই দাবিরও কোন ভিত্তি নাই। তেমনি ভিত্তি নাই এই বক্তব্য যে ‘প্রমিতের এই দাপটের পরবর্তী কালে লিখিত রীতিতে যে অপ্রমিতের আগমন তা লঘুতার দর্শন দেয়’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আর ইংরেজ সাহেবদের তৈয়ারি ‘প্রমিত’ বাংলার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাহিত্য চর্চা করেছেন। তাঁর সাফল্য আপনার কথিত ‘অপ্রমিত’ পথে, তাই না? মুশকিল হচ্ছে এখন কলকাতার ভাষাকেই ‘প্রমিত বলে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পুলিশী করা হচ্ছে। আমরা তার প্রতিবাদ করছি। এটা অবশ্যই করতে হবে। রাষ্ট্র, আদালত, বাংলা একাডেমি কিম্বা কলকাতাবাদী সাহিত্য সিন্ডিকেট কেউই কে কিভাবে লিখবে তার হুকুম দিতে পারে না। এই এখতিয়ার তাদের নাই। যে কারণে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আপনার অবদানকে আমি রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ গণ্য করি।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নতুন ধরণের বাংলা ভাষা পয়দা করতে গিয়ে মৃত্যঞ্জয় বিদ্যালংকারদের ভাষার পাশাপাশি সাহিত্য নিয়ে ‘ফাইজলামি’ করেন নি। তাকে তাঁর ভাষার সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে হয়েছে। দেখাতে হয়েছে বিদ্যালংকারদের ভাষায় বাংলা ভাষার নতুন ভাবচর্চা অসম্ভব। কিন্তু তাঁর তখনকার সময়ের জন্য ‘অপ্রমিত’ ভাষায় সম্ভব। তো কিভাবে সম্ভব সেটা চর্চা করেই তাঁকে দেখাতে হয়েছে। তাহলে এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের দুটো অর্জন, এবং তারা পস্পর থেকে আলাদা। এক: রাজনৈতিক – অর্থাৎ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও ইংরেজ সাহেবদের তৈয়ারি প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। দুই: বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের জন্য নতুন একটা ভাষা তৈরি। ইতিহাসের এই শিক্ষাকে উপেক্ষা করবেন না।

আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি নতুনদের ভাষা বিদ্রোহের রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম। তারা বাংলাদেশের অনাগত কিছু বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটবার আগাম লক্ষণ হিসাবে হাজির হয়েছে। শেষাবধি কি দাঁড়াবে আমি জানি না। কিন্তু এর সম্ভাবনা অপরিসীম। এই ঝাণ্ডা আপনার হাত দিয়ে উর্ধে তোলা হয়েছে, এখানেই আপনার গুরুত্ব। কোন রাজনৈতিক দল বা সরাসরি রাজনীতি করারা চেয়েও এই সাহিত্যিক/রাজনৈতিক কাজ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার নান্দনিক অর্জন এখনও বিশেষ কিছু নাই। তাকে ফাইজলামি করে অপচয় করবার যে প্রপাগাণ্ডা আপনি চালাচ্ছেন সেটা আমি মেনে নিতে পারছি না। এটা আপনার অক্ষমতা হতে পারে, অথবা আপনি আচরণগত ফাইজলামিকে ভাষাচর্চার ফাইজলামি বলে সমার্থক গণ্য করছেন। ফাইজলামি খারাপ না, কিন্তু কখন কোথায় ফাইজলামি চলে না এই ভেদবুদ্ধি যাদের নাই তাদের সিরিয়াস আচরনগত সমস্যা আছে। এদের ক্ষমা করা যায়, কিন্তু সেটা সাহিত্যের তত্ত্ব আকারে হাজির হলে সেটা আপদ হয়ে ওঠে।

আপনার মন্তব্যের শেষের দিকের পুচ্ছে আরও কিছু দাবি করেছেন আমি মেনে নিতে পারছি না। উত্তর দিতে গেলে বড় হবে বলে আপাতত ক্ষান্ত দিচ্ছি। পরে সময় পেলে তার উত্তর দেব।

৫. ব্রাত্য রাইসু (১২ এপ্রিল ২০১৪) :

আমি কেবল প্রমিত ভাষা নয় প্রমিত আচরণের গণ্ডিও অতিক্রমের আহ্বান জানাইছি। তবে তা দিয়া সাহিত্য বিচারের দাবি জানাই নাই। কারো আচরণগত সমস্যা নিয়া আমরা কীই বা বলতে পারি? তার সঙ্গে আপনি বড়জোর মেলামেশা বন্ধ করতে পারেন। তারে মানুষ করার চেষ্টা করাটা মাষ্টারি হবে। সাহিত্যকর্মীদের ব্যাপারে মাষ্টারি করাও তো আচরণগত সমস্যাই।

রবীন্দ্রনাথ কিছু করেন নাই, তিনি এই চলতিতে লেখনের আগে এই ভাষা মেয়েলি চলতি ভাষা হিসাবে চালু ছিল। লিখিত ভাবেই ছিল।

অপ্রমিত ভাষা যেমন তথাকথিত প্রমিতও তথাকথিতই। তাই এই নিয়া বলি নাই। আলাপের সুবিধার্থে ভাষা বলতে হইল। রীতি বলাই ভালো।

প্রমিত ভাষায় ফাইজলামি করলে সেইটা রম্য ক্যাটেগরিতে পড়ে। এইভাবে ফাইজলামিকে প্রমিত আলাদা কইরাই রাখে। তাতে প্রমিতের সিরিয়াস ভঙ্গির জয়যাত্রাই বহাল থাকে। আপনি প্রমিতের এই ক্যাটেগরি বিভাজনরে অর্থাৎ সিরিয়াসনেস ও রম্যের উচ্চ-অধঃরে অপ্রমিতে রপ্তানি করতে চাইতেছেন কি?

আপনি আচরণগত ফাইজলামি নিয়া আগে প্রসঙ্গ তোলেন নাই। বরং কীভাবে নিষ্ঠার অভাবে অপ্রমিতের লেখালেখি ফাইজলামিতে পর্যবসিত হয় তা বলছেন। আমি সে বিষয়ে কথা কওয়ার পাশাপাশি আচরণগত ফাইজলামি বা অপ্রমিত রীতিরে অভিষিক্ত করতেছি। দুইটা মিললে সমস্যা নাই, না মিললেও নাই। ডিমে তা দেওয়ার জন্য নিষ্ঠা দরকার হইতে পারে, ডিম ভাইজা খাইতে গেলে সে নিষ্ঠার দরকার নাই। সাহিত্য বা জীবনযাত্রা কেবল ডিমে তা দেওয়া না। জাস্ট ডিম ফাটাইয়া দেওয়াও হইতে পারে। তারে আচরণগত সমস্যা বললে আপনি আপনার সমাজ বা আচরণরে ছহি ধইরা লইতেছেন। তা লন।

৬. ফরহাদ মজহার (১২ এপ্রিল ২০১৪) :

প্রমিত আচরণের গণ্ডি অতিক্রমের আহ্বান জানান, সেটা আপনার সমাজ ও সামাজিক সম্পর্ক চর্চা সম্বন্ধে অবস্থান। ব্যক্তিগত ব্যাপার, এর দায় দায়ত্ব আপনার। এ ব্যপারে আমার কিছুই বলার নাই। একে ভাল বা মন্দ কিছুই আমি বলি নাই।

“আপনি প্রমিতের এই ক্যাটেগরি বিভাজনরে অর্থাৎ সিরিয়াসনেস ও রম্যের উচ্চ-অধঃরে অপ্রমিতে রপ্তানি করতে চাইতেছেন কি?” — না। দেখুন, প্রমিত কি অপ্রমিত কোন ক্ষেত্রেই সাহিত্যের পুলিশ হবার বাসনা আমার নাই। উচ্চ/অধঃ ভাগাভাগি তো আমি করি না। আপনি আপনার অপ্রমিতেরে উচ্চাসনে দিতে চান, সকলকে ফাইজলামির আহ্বান জানান — এইসব তো আমি করি না। আপনি করছেন। আমি অপ্রমিত কি অপ্রমিত সব ভাষাতেই সমান আগ্রহী। সাহিত্য যখন নতুন কোন ভাংচুরের ঘটনা ঘটতে শুরু করে তখন তাকে রাজনৈতিক/নান্দনিক নানান দিক থেকে বোঝার আগ্রহ আমার আছে।

আর বোঝাবুঝির জগতটা বিশুদ্ধ সাহিত্যের জগত না। আপনি ভাত খেয়ে ভাত হজম করতে পারেন,কিন্তু কিভাবে ভাত হজম হয় সেটা জানার জন্য আপনি ফিজিওলজি/এনাটমি পড়েন না। সেটা ডাক্তারি শাস্ত্রের কাজ। ঠিক তেমনি লেখালিখি এক জিনিস, আর আর লেখলিখিকে ‘বোঝা’, তার তাৎপর্য বিচার কিম্বা বোঝার জন্য বিভিন্ন জেনারে (genre) শ্রেণিকরণ ভিন্ন একটি কাজ। কোন কিছু নিয়ে আলোচনার সময় এই পার্থক্যগুলো মনে রাখা দরকার। উদ্ভিদবিদ্যা না জেনেও ফুল ফোটে তাই না? কিন্তু ফুল ফোটার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সময় বোটানি না জেনে উপায় থাকে না।

“ডিমে তা দেওয়ার জন্য নিষ্ঠা দরকার হইতে পারে, ডিম ভাইজা খাইতে গেলে সে নিষ্ঠার দরকার নাই। সাহিত্য বা জীবনযাত্রা কেবল ডিমে তা দেওয়া না। জাস্ট ডিম ফাটাইয়া দেওয়াও হইতে পারে।”

ঠিক আছে। আপনি ডিম ফাটাইয়া খাইতে থাকেন, তাতে আমি আপত্তির কিছু দেখি না। কিন্তু আমি তো ডিম ভাজা খাইবার আলোচনা করছি না। ডিমের অভ্যন্তরে যে প্রাণের সম্ভাবনা হাজির হয়েছে তাকে ফোটানোর কথা বলছি। কিন্তু আপনাকে আমার কথা বোঝাতে পারলামনা বলেই মনে হয়।

রাইসু, আমাদের পথ আলাদা। আমরা আলোচনা এখানে শেষ করতে পারি। আপনি ডিম ভাইজা খাইতে চান, আমি ফুটাইতে চাই। ঠিক কিনা? কি বলেন?

[১২ এপ্রিল ২০১৪ এর পরে ২১ জুন ২০১৮ তে ফরহাদ মজহার পুরানো বিষয়ে নতুন আলাপ শুরু করলেন। – রাইসু]

৭. ফরহাদ মজহার (২১ জুন ২০১৮) :

বহুকাল আগেই বলেছি, ভাষায় ফাইজলামি আচরণের মামলা। কিন্তু তারপরও যারা ভাষা নিয়ে ভাংচুর করেছেন তাদের রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রশংসা করেছি। কিন্তু এবাদুর রহমানের কথা না বললে আমার কথা পুরাটা বোঝা যাবে না।

যে সমাজ বুর্জোয়া চেতনা বা ব্যক্তির বিকাশ ঘটাইতে পারে নাই, সেই সমাজে পেটি বুর্জোয়াদের বকবকমই সাহিত্য হয়ে ওঠে। ফলে সাহিত্য সংস্কৃতি সর্বত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমির মালিকরা যেমন তাদের জমিদার ভাবে, তেমনি তারাও মনে করে তারা একেকজন সাহিত্য এস্টেটের জমিদার। ব্যক্তির বিকাশ রুদ্ধ হলে ব্যক্তিতন্ত্রের বিকার অনিবার্য। এই বিকার এই ভাবে সাহিত্যেও প্রতিফলিত হয় । কিন্তু আফসোস করার কিছু নাই। এটা আসলে শুধু সাহিত্যের সমস্যা না, বরং সমাজ ও রাজনীতির সমস্যা।

এবাদুর রহমান তার সমবয়েসী আরো অনেকের মতো প্রমিত/অপ্রমিত ভাষা নিয়া খামাখা উচ্চবাচ্য বা বকোয়াজগিরি করেন না। ভাষার ভাংচুরের কাজ তিনি নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে করেন। ফলে বাংলা সাহিত্যে ভাঁড়ের ভূমিকায় এবাদুরের নামতে হয় না। ফাইজলামি বা ব্যক্তিতান্ত্রিক বিকার থেকে তার ভাষা মুক্ত। এবাদুর গুরুত্বপূর্ণ কারন প্রমিত ভাষার বিপরীতে অপ্রমিত ভাষা নিয়া ফাজিল সাহিত্য না করে তাকে পূর্ব বাংলার সাহিত্যচর্চার ভাষায় উন্নীত করার চেষ্টা এবাদুরের মধ্যে আছে। এবাদুর অবশ্য শুধু গুটেনবার্গের মেশিনে উৎপাদিত অক্ষর নিয়া কায়কারবার করেন না। পেইংটিং, আর্কিটেকচার, সিনেমা এবং সর্বোপরি দর্শনেও তার আগ্রহ।

ভাষায় ফাইজলামি খারাপ না, কিন্তু ব্যক্তিতান্ত্রিক বিকার থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ।

৮. ব্রাত্য রাইসু (২১ জুন ২০১৮) :

আমি নতুন কিছু বলতে চাই না। আমার আগের লেখায়ই (দ্রষ্টব্য পয়েন্ট ২; ৩১ মার্চ ২০১৪) যা বলার তা আছে।

যেমন:

ক.
“ফাইজলামি যে কোনো ভাষায় সাধিত হইতে পারে, এইটা অপ্রমিত ভাষার সাধারণ গুণ না। চর্চার ক্ষেত্রে কে কোন জিনিস নিয়া আগাবে তা তার তার ব্যাপার।”

খ.
“কেউ অপ্রমিত ভাষায় লেখে তাই তার মধ্যে ফাইজলামি আছে এমন দেখতে পাওয়াটা পুলিশি দৃষ্টিপাত।”

গ.
“ফাইজলামি প্রতিবন্ধক না। বরং এও এক সম্ভাবনা। প্রমিত-অপ্রমিত সব ভাষায় আরো আরো ফাইজলামি করতেই বরং আমি আহ্বান করব সবাইরে।”

ঘ.
“গম্ভীর বা সিরিয়াস ভঙ্গিই বরং ভাষার সম্ভাবনারে অভিনয়ের কারণে তথা দুর্বল প্রকাশভঙ্গির কারণে সীমিত করে।”

ঙ.
“বৈচিত্র সব ভাষায়ই আছে বা থাকে। ভাষা এই জন্যেই ভাষা যে তার ভাব বা ভঙ্গি একটি মাত্র নয়।

তা যেমন ফাইজলামি দিয়া প্রকাশিত হয়, ভাবগাম্ভীর্য দিয়াও হয়।

যেইখানে ফাইজলামির দরকার সেখানে ভাবগাম্ভীর্য হয়তো অধিকতর ফাইজলামিরই ব্যাপার। ”

চ.
“অপ্রমিত ভাষা বা রীতি নিষ্ঠ হওয়া ছাড়াই, গভীর হওয়া ছাড়াই, তথাকথিত বড় বিষয়রে বড় হিসাবে পাত্তা না দিয়াই দর্শন জিনিসটারে অস্পষ্টতা ও অপরিচ্ছন্নতাসহ আলাপে আনার চেষ্টা করে।”

ছ.
“সঠিকতা, পরিচ্ছন্নতা, স্পষ্টতা অপ্রমিত ভাষার বা রীতির দর্শন নয়। সেইটা প্রমিতের, আনুষ্ঠানিকতার, সংঘের বা ছাত্র পড়ানোর দর্শন।

যদি সঠিকতা নাই তবে নিষ্ঠা কীসের!”

***

এই যে আবার উদ্ধৃত করতে হইল এইটা একটা সিরিয়াস কারণে। কারণটা হইল, ফরহাদ মজহার এই পয়েন্টগুলারে সিরিয়াসভাবে খেয়াল কইরা থাকলে ওনার কথাবার্তা এত লম্বা করতে হইত না।

আর ব্যক্তিতন্ত্রের বিকার এইটা আমার সমস্যা না। ফরহাদ ভাইয়ের নিজের সমস্যা। ওনার ব্যক্তিতন্ত্র শিষ্যযুক্ত ব্যক্তিতন্ত্র। যেইটারে উনি সমষ্টি মনে করেন তা হয়ত ওনার শিষ্যকুল প্রভাবিত ব্যক্তিতান্ত্রিক বিকারের সমষ্টি।

#

Facebook Comments

1 Comment

Add Yours →

চমৎকার আলাপ। ফরহাদ মজহার ব্রাত্য রাইসুর যে বড় অবদানটার কথা বললেন, আলাপের অল্পকিছু অংশ সেদিকে গেলে, আলাপটা সাধারণের কাছে বুদ্ধিগ্রাহ্য
বাহাস থেকে এক ব্যবহারিক রাজনৈতিক মাত্রা পেতো বলে আমার ব্যবহার। মজহার এই তাৎপর্যকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে, নিজের পথে হাঁটা দিছেন।

আমি বলতে চাইছি, ভাষাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে হাজির করে তার দিকে সাংগঠনিক আহবান জানানো হলো রাইসুর একটা মৌলিক অবদান। এটা কিন্তু সবাচাইতে বড় ভবিষ্যতমুখি অবদান। এই রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা থাকার কারনেই হয়তো (প্রমিত) চলিত ভাষায় মজহার রবীন্দ্রনাথকে বড় দেখলেন, রাইসু প্রমাণ করলেন, রবীন্দ্রনাথের অবদান শুধুই তা অনুসরণকারীর।

কাজেই, সমাজ ও তার পারিপার্শ্বিকতাকে নানান জটমুক্ত করে সরলভাবে দেখার জন্যে রাজনৈতিক স্বচ্ছ (এই স্বচ্ছতা অনেক জায়গায়তেই একটা বিদ্রোহী অবস্থান নির্দেশক) দৃষ্টিভঙ্গির দরকার হয়। নাহলে, অনুকরণকারীরেও ওই বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির অভাবেই, ভুল করে আবিষ্কারকারীর মুকুট পরাইয়া দেই।

কাজেই বিদ্রোহটা কোনো খেলো বিষয় না। ফাজলামি আকারে হোক, প্রতিষ্ঠিত হেজেমনিকে সরাসরি অস্বীকার করে হোক, বিদ্রোহটা জারি রাখতে হবে। অবশ্যই এই বিদ্রোহের পথ সবার না।
…”এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালোবাসে, তবুও কাছে নাহি পায়।

খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে, নীরবে চোখে চোখে চায়।

দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে, বুঝাতে নারে আপনায়।

দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা—কাতরে কহে, ‘কাছে আয় !’

বনের পাখি বলে, ‘না, কবে খাঁচায় রুধি দিবে দ্বার !’

খাঁচার পাখি বলে, ‘হায়, মোর শকতি নাহি উড়িবার।’

কে খাঁচায়, কে বাইরে, তা বুঝবো ওই বিদ্রোহ দিয়েই। জিনিসটা সামান্য না।
অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply