ভাঙা গড়ার রবীন্দ্রনাথ: প্রাচ্যনাট-এর ‌’রাজা …এবং অন্যান্য’

রাজা নাটকের দৃশ্যে আফসানা মিমি, প্রেসের জন্য দেয়া ছবি থেকে
রাজা নাটকের দৃশ্যে আফসানা মিমি, প্রেসের জন্য দেয়া ছবি থেকে

দুইদিন আগে আমিরুল রাজীভ ফোন কইরা জানাইলেন, প্রাচ্যনাটের একটা নাটক হবে বৃটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে আমি যেন যাই। আমি ওনারে জিজ্ঞেস করলাম টিকেটের ব্যবস্থা আছে কিনা? জানাইলেন আছে, তবে আমারে এমনেই দেখাইবেন। আমি বুদ্ধিজীবী হিসাবে সমাজে নাটকে আমন্ত্রিত হইতেছি এইটা ভালো লাগলো না। আমি ভাবলাম টিকেট কাইটাই ঢুকব নে। তো গিয়া দেখি টিকেট-এর দাম আছে কিন্তু টিকেট বিক্রয় হবে না। আমিরুলরে খোজ কইরা একটু পরে ওনার ফোন পাইলাম। এবং আমি ভিতরে যাইতেই খাতা বাড়াইয়া দিলেন। সই নিলেন। বললেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর-এর একজন হিসাবেই উনি আমারে দাওয়াত দিছেন। একটা সিডিও ধরাইয়া দিলেন। লেখক থিকা ধাক্কা দিয়া সাংস্কৃতিক রিপোর্টার বানাইয়া দিলেন। টাফ জব। তবে আমি তাতে অরাজি না। বুঝলাম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হইয়া উঠতে ঢের বিলম্বিছে, আপাতত সাংবাদিকখানি হওয়া গেছে, এই অনেক বটে।

নাটকের নাচের দৃশ্য
নাটকের নাচের দৃশ্য

রাজীভ দাড়ি রাখেন, লম্বা চুল, দেখতে নুরানী। অনুরোধ করলেন আমি যেন রিপোর্টটা করি। আমি জানাইলাম, ‘আমি তো ঠিক রিপোর্ট করি না।’ মানে বলতে চাইলাম, আমি তো লেখক! কিন্তু উনি আমারে লেখক হইতে দিবেন না। জানাইলেন, আমি লিখলে খুশি হইবেন।

তো সে কারণেই এই রিপোর্ট। নাটক দেইখা ভালো লাগল। অনেক পোস্ট মডার্ন ব্যাপার সেপার আছে। রবিবাবুর রাজা নাটকে লাদেন হুগো শ্যাভেজের নামও নেয়া হইছে। নানা এই কালের সরঞ্জাম ঢুকছে নাটকে। তবে মোবাইল ফোন বোধহয় নাই। (মাঝখানে টয়লেটে গেছি, তখন দেখাইয়া থাকলে বা রিং টোন শোনাইয়া থাকলে জানি না।) ছেলেমেয়েরা হিন্দি/তামিল (নাকি বাংলা?) সিনেমার ঢঙে নাচছেও। সাংস্কৃতিক গ্রহণ! ভালোই লাগছে। সদর্থে। তবে…

সেইটা পরের প্যারার পরে কই।

২.
৪ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় প্রাচ্যনাট তার ১৪ তম প্রযোজনা রাজা এবং অন্যান্যর প্রথম মঞ্চায়নের আয়োজন করে ঢাকার বৃটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে। সাংবাদিক ও অতিথিদের জন্যই এ শো-এর আয়োজন করা হয়েছিল বলে মনে হয়। বৃটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে মাঝখানে মঞ্চ বসিয়ে ও দুধারের দেয়ালে কম্পিউটার থেকে পর্দায় যুদ্ধ, বোমা, আগুন, হানাহানির দৃশ্য প্রক্ষেপ করে নাটক উপস্থাপন করা হয়েছিল। মঞ্চে যখন চলছিল রাজা নাটকের বিবিধ গমনাগমন দেয়ালে তখন কখনো বুশ কখনো টুইন টাওয়ার– ধ্বংসিছে। আর মঞ্চের তিন পাশে দর্শক ও এক পাশে কুশীলবরা বসেছিলেন। আমার সামনে বসছিলেন শফি আহমেদ। বায়ে আজফার হোসেন।

রাজা নাটকের নির্দেশনায় ছিলেন আজাদ আবুল কালাম। সুদর্শনার ভূমিকায় অভিনয় করেন আফসানা মিমি। মিমির আড়ষ্ট অভিনয় নিয়া মন্তব্য শুনলাম। কে বলছে বলব না। মিমির ডায়ালগ কাটা কাটা মুখস্থ ধাচের ছিল। (মুখস্থ করলে তো মুখস্থই মনে হবে।) মনে হইতে ছিল মিমি বোধহয় অন্য কোনো অভিনেত্রীরে ডায়ালগ বইলা দিতেছেন। দ্রুত ডায়ালগ সাইরা ফেলানোর তরেই হয়ত এই থ্রোয়িং।

নিচে প্রাচ্যনাট-এর দেয়া পরিচিতিমূলক দুটি পৃষ্ঠা থেকে নাটকের কাহিনী সংক্ষেপ ও নির্দেশকের কথা অংশটি দেয়া গেল। নির্দেশক তার কথায় জানিয়েছেন, আমেরিকানাইজেশনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের “রাজা” মেটাফোর হয়ে ধরা দেয়। নাটকে কম্পিউটার মারফতে দেয়ালের পর্দায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ছবি বা অন্য নানা দৃশ্য দেখানো হয়েছে। তবে তার সঙ্গে রবিবাবুর রাজার সংযোগ বোঝা গেল না! এবং রাজা কেন বা কীভাবে আমেরিকানাইজেশনের বিরুদ্ধে একটি মেটাফোর তাও পরিষ্কার হলো না। নির্দেশক লিখেছেন, ‘আমি দেখি কাঞ্চীরাজ আর তার ছয় সঙ্গী অন্যান্য “রাজা” আসলে সাম্রাজ্যবাদের নতুন নকশার স্থপতি।’ এইভাবে দেখতে গেলে আমার ধারণা সাম্রাজ্যবাদীদের বিবিধ অ্যাকশনরে ছোট কইরা বা কম কইরা দেখার প্রবণতা জন্মাবে। যা শেষ পর্যন্ত নরহত্যাকারীদের পাপ লঘু করার শামিল হবে। রূপকের এই সমস্যা থাকেই। যেহেতু রূপক, তা প্রায়ই ছোট জিনিসরে বড় কইরা দেখায়, এবং কখনো কখনো, যেমন এই অবসরে, বড় জিনিসরে ছোট কইরা ফেলাইছে। এবং আপাত অদ্রবণীয় জিনিস নাটকে অদ্রবীভূতই থেকে গিয়েছে। ফলে এক্সপেরিমেন্টাল এই নাটক আরো এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে দিয়া, চাইলে, যাইতে পারে।

—————————————————————–

কাহিনী সংক্ষেপ
সুদর্শনা রাজাকে বাহিরে খুঁজিয়াছিল। যেখানে বস্তুকে চোখে দেখা যায়, হাতে ছোঁয়া যায়, ভাণ্ডারে সঞ্চয় করা যায়, যেখানে ধন-জন-খ্যাতি, সেইখানে সে বরমাল্য পাঠাইয়াছিল। বুদ্ধির অভিমানে সে নিশ্চয় স্থির করিয়াছিল যে, বুদ্ধির জোরে সে বাহিরেই জীবনের সার্থকতা লাভ করিবে। তাহার সঙ্গিনী সুরঙ্গমা তাহাকে বলিয়াছিল, অন্তরে নিভৃত কক্ষে যেখানে প্রভু স্বয়ং আসিয়া আহ্বান করেন সেখানে তাঁহাকে চিনিয়া লইলে তবেই বাহিরে সর্বত্র তাঁহাকে চিনিয়া লইতে ভুল হইবে না; নহিলে যাহারা মায়ার দ্বারা চোখে ভোলায় তাহদিগকে রাজা বলিয়া ভুল হইবে। সুদর্শনা এ কথা মানিল না। সে সুবর্ণের রূপ দেখিয়া তাহার কাছে মনে মনে আত্মসমর্পণ করিল। তখন কেমন করিয়া তাহার চারিদিকে আগুন লাগিল, অন্তরের রাজাকে ছাড়িতেই কেমন করিয়া তাহাকে লইয়া বাহিরে নানা মিথ্যা রাজার দলে লড়াই বাধিয়া গেল, সেই অগ্নিদাহরে ভিতর দিয়া কেমন করিয়া আপন রাজার সহিত তাহার পরিচয় ঘটিল, কেমন করিয়া দুঃখের আঘাতে তাহার অভিমান ক্ষয় হইল এবং অবশেষে কেমন করিয়া হার মানিয়া প্রাসাদ ছাড়িয়া পথে দাঁড়াইয়া তবে সে তাহার সেই প্রভুর সঙ্গলাভ করিল যে প্রভু সকল দেশে, সকল কালে, সকল রূপে-আপন অন্তরের আনন্দরসে যাঁহাকে উপলব্ধি করা যায় এ নাটকে তাহাই বর্ণিত হইয়াছে।

নির্দেশকের কথা
Critics and detectives are naturally suspicious. They scent allegories and bombs where there are no such abominations. Its difficult to convince them of our innocence…..

Rabindranath Tagore
15th Nov. 1914

উপরের উদ্ধৃতি “রাজা”র এক সমালোচনা প্রসঙ্গে সি.এফ. এ্যান্ড্রুজকে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠির অংশ বিশেষ। আমাদের প্রযোজনা “রাজা”ও আমরা শুরু করি এক সমালোচনা এবং আলোচনার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে। “রাজা” সম্পকে এ পর্যন্ত যে সব আলোচনা আমরা পাই এবং রবীন্দ্রনাথের নিজের সংশ্লিষ্ট ভাবনাগুলো মনোযোগে নিয়ে সমকালীন এক বিশ্লেষনে ব্রতী হই। এই বিশ্লেষন কখনো মনে হতে পারে “রাজা”র ভিতর সময়কে দেখার অথবা সময়ের ভিতর বাস করে “রাজা”কে দেখা। কৈশরে “রাজা” পাঠে মিশ্র অনুভবের জন্ম হয়েছিল, সুন্দর অসুন্দরকে নিয়ে, অলিক এক রাষ্ট্রের না দেখা “রাজা” এবং তার শাসন প্রণালী নিয়ে, সেই ভাবনা এখনও যেন তেমনই আছে-তবে তার সাথে যোগ হয়েছে আজকের বিশ্ব এবং এই বিশ্বে বাস করার আমাদের অভিজ্ঞতা। “রাজা” কেন প্রযোজনা করতে চেয়েছিলাম অনেক আগে তা এখন স্মরণ করতে পারি না-তবে হঠাৎ করে ঐতিহাসিক ৯/১১ এর ঘটনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতি আমাকে আবার নতুন করে রবীন্দ্রনাথের “রাজা”কে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি দেখি কাঞ্চীরাজ আর তার ছয় সঙ্গী অন্যান্য “রাজা” আসলে সাম্রাজ্যবাদের নতুন নকশার স্থপতি। আর বিশ্বজুড়ে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ নতুন ব্যাখা পেয়েছে আমেরিকানদের হাতে, তাতে অন্যান্য জাতিসত্তা বিশেষত যারা এক ধরনের নিজস্ব সংস্কৃতি রাজনীতি নিয়ে নিজেদের মত আছে তারা হয়েছে হুমকির স্বীকার। কখনো সন্ত্রাস দমন, কখনো গণতন্ত্র (!) পুনঃস্থাপন ইত্যাদি নানা নামে এবং বিশ্বায়নের দোহাই দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ঝাপিয়ে পড়ছে সর্বত্র-আদতে খেয়াল সারা বিশ্বকে রাজনৈতিক-সামাজিক-বাণিজ্যিক কব্জায় নিয়ে আসার একটা প্রক্রিয়া স্থাপন যার আরেক নাম আমেরিকানাইজেশন। এর বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের “রাজা” আমাদের কাছে এক মেটাফোর হয়ে ধরা দেয়। এই পরাক্রমশালী “রাজা” আমাদের কাছে শুধু ইউটোপিয়া থাকে না-হয়ে যায় আরাধ্য-আমরা ভবিষ্যত ‘সোনার হরিণ’ দেখতে চাই বিশ্বের সব ভুক্তভোগী মানুষ একত্র হয়ে। এই দেখবার বাসনা থেকে এক ধরনের পরিবর্ধন এবং সংযোজনে নিবিষ্ট হতে হয়, এই পরিবর্ধন রবীন্দ্রনাথকে কেটে ছেটে নয় বরং “রাজা’র সাথে একাত্ব হবার মানসে। আমরা প্রায় সবাই সুদর্শনার মত একটা জীবন পরিক্রমা করে বুঝে নিতে চাই, যুঝে নিতে চাই সত্যকে- “রাজা”র সাথে মিলে পরাজিত দেখতে চাই কাঞ্চীকে, যেন কাঞ্চী চিৎকার করে পাগলের মত প্রলাপ বকে-Give over the play. Give me some light, away, Lights, Lights, Lights….

আজাদ আবুল কালাম
০৩০৩০৮

—————————————————————–

 

 

রাজা নাটকের দৃশ্য
রাজা নাটকের দৃশ্য

নাটক দেখার পরে বিপ্লব বালা বললেন, নাটক তার খুবই ভালো লেগেছে। রবীন্দ্রনাথকে যে ভাঙা হয়েছে এটা তার ভালো লেগেছে। বিপ্লব বালা রবীন্দ্রনাথ ভাঙায় খুশি হইতেছেন সেইটা নিশ্চয়ই খুশির খবর। কিন্তু কী ভাঙা হইল রবীন্দ্রনাথের? আমি নাটকের ভোক্তা না, রবীন্দ্রনাথের নাটকের মইধ্যে পাঙ্ক র‌্যাপ আনা হইছে দেখতে পাইছি, কিন্তু সেসব বস্তু যে ‘পরদেশী’ জিনিস ‘অপসংস্কৃতি’র অংশ সেসব স্পষ্টই ছিল নাটকে। (অন্য সংস্কৃতির প্রতি বিরূপতা?) বিপ্লব বালারে জানাইলাম, আমি ভিন্ন মত। তিনি পরে শুনবেন, কথা দিছেন।

নাটকে উজ্জ্বল উপস্থিতি রোহিনী চরিত্রের সানজিদা প্রীতির নাম মঞ্চের ক্ষেত্রে দেখলাম ‘সানজিদা আনোয়ার’। ঘটনা কী? এইটা কি তোলা নাম, অভিজাত মঞ্চ সমাজের তরে?

ঢাকা, ৫/৩/৮

লিংক: আর্টস, bdnews24.com

Flag Counter

0 Comments

Add Yours →

Leave a Reply