তর্কের যে নিয়ম প্রশ্নহীনভাবেই গ্রাহ্য তার বাইরের তর্ক

মুখের ভাষায়—বলা নয়—লেখাটাই মামলা (মার্চ ২০১০)

ফরহাদ মজহার ১/৩/২০১০ তারিখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর মতামত-বিশ্লেষণ পাতায় একটা লেখা লিখছিলেন “ভাষা ব্যবহারের ওপর আইনী খবরদারী অথবা ফ্যাসিবাদের নতুন ধরণ” নামে। সেই লেখারে ধইরা মাহবুব মোর্শেদ ১৪/৩/২০১০-এ ফেসবুকে নোট দিছেন: ”কাহিনী কিন্তু খালি ক্রিয়াপদ নিয়া না, ফরহাদ ভাই”।

মাহবুব মোর্শেদ লিখছেন:
“আমি স্পষ্ট দেখতেছি, লোকজন যেইখানে সমানে একটা ভাষায় কথা কইতেছে তখন ফরহাদ ভাই সেইটারে তরুণ সাহিত্যিক এক্সপেরিমেন্টাল ভাষা উদ্যোগ হিসাবে চালানোর চেষ্টা করলেন। সাহিত্যিকরা আগায়া গিয়া ভাষাটারে আলিঙ্গন করছে, তারা বানায় নাই।”

তিনি আরো লিখছেন,
“মজার ব্যাপার হইলো- ঘরে বাইরে সবাই এখন এই ভাষায় কথা কয়। মেলা দিন ধইরা কথা কইতেছে। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে আমেরিকান ইংরেজি যেমনে আলাদা হয়া গেছিল সেইভাবে আমাদের বাংলাও আপসে আপ কলকাতার বাংলা থেকে আলাদা হয়া যাইতেছে। এইটা ব্রাত্য রাইসু, আনিসুল হক, মুস্তাফা সরয়ার ফারুকীর সাহিত্য বা সিনেমার মামলা না। এইটা একটা জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষা বানানোর মামলা।“

আমার নাম থাকায় এই বিষয়ে কথা লিখতে ইচ্ছা হইলো। কলকাতার বাংলায় কিন্তু পুবের লোকরা তেমন একটা কথা আগেও বলতো না। এইটা আগে থিকাই আলাদা আছে। প্রবলেম লেখার ভাষা নিয়া।

২.
তো মাহবুব, যারা এই ভাষায় কথা বলে তারাও কিন্তু কেউ এই ভাষারে বানায় নাই। এই ভাষাখানি অনেক দিন ধইরাই আছে।

কিন্তু লেখার ভাষারে এর বাইরে গিয়া দেখতে হইব। যদিও লেখার ভাষার উপাদান এই মুখের ভাষাই। মুখের ভাষাটাতে লেখনের সিদ্ধান্তটা বৈপ্লবিক। এবং লেখা শুরু করাটা বিপ্লব। বলুয়ারাও আগে শুদ্ধ ভাষায়ই লিখতেন। সেই রীতি যদি কেউ ভাইঙ্গা দিয়া থাকেন, প্রবর্তন কইরা থাকেন লেখার নতুন রীতি… তারে ধর্তব্য না-করলে মাননীয় না-করলে বা যেন-ঘটে-নাই-করলে অবিচার করবেন। প্রবর্তনারে ছোট কইরা দেখনের জো নাই। এইটাই মামলা। হইতে পারে যে এই ভাষায় অনেকেই কথা বলে। তো তারা লেখে কেন শুদ্ধ ভাষায়? কী লুকায় তারা?

৩.
আর এই লেখার ব্যাপারটারে ঠিক আলিঙ্গন থিয়োরির (“সাহিত্যিকরা আগায়া গিয়া ভাষাটারে আলিঙ্গন করছে, তারা বানায় নাই।”) মইধ্যেও ফেলন যায় না। কারণ যারা এই ভাষায় লেখা শুরু করছেন তারাও তো এই ভাষাই বলেন বা বলতেন। তারা নিজেগো মুখের ভাষারে নিজেরা আলিঙ্গন করছেন এমন বলা যায় না।

৪.
নাটক ইত্যাদিতে চরিত্রের মুখে যখন এই ‘খিচুড়ি’ ভাষা আসে তা নাট্যকারের ভাষা না, চরিত্রের ভাষা। সেই রকম তো সৈয়দ শামসুল হকের পরাণের গহীন ভিতর-এও আছে। তা কবির ভাষা না, কবিতায় ধরতে চাওয়া একটা গুষ্ঠীর ভাষা। এমন মিশনারী কাণ্ড মহাশ্বেতায়ও আছে মনে হয়। চোট্টি মুণ্ডা ও তার তীর-এ। মহাশ্বেতার বাবা মনীশ ঘটক (যুবনাশ্ব) নাকি গল্প লেখছিলেন পুরাই ছোটলোকের গদ্যে, পটলডাঙ্গার পাঁচালী। ওইগুলারে বলতে পারেন আলিঙ্গন। প্রগতিশীল উন্নয়নমার্গী প্রমিত অলারা নাটক সিনেমা গল্পে ছোটলোকের ভাষায় ছোটলোকের জীবন-যাপনরে এক্সপ্রেস কইরা ভাবেন আয় হায় কী জানি কইরা ফেলাইছি! আর দেখেন কী যে আশ্চর্য, ওনারা নিজেগো ডেইলি লাইফরে ওনাগো শ্বাশত ভাষা প্রমিততেই ধরতে চান, যেইটা এক প্রকার বইয়ের ভাষা। সেইখানে নিজেগো জীবনের গদ্য অনুপস্থিত! তাই এই আলিঙ্গন কৃপা বা সুদৃষ্টিমূলক।

সরয়ার ফারুকীর নাটক-সিনেমায় চরিত্রের ব্যবহৃত ভাষা আর পরিচালক হিসাবে দর্শকদের সঙ্গে তার যোগাযোগের ভাষা (টাইটেল ও অন্যান্য বর্ণনা) আলাদাই থাকে। মিডিয়ায় সরয়ারের নিজের ভাষা প্রমিত, তার চরিত্ররা ‘খিচুড়ি’ ভাষার। এইখানে সরয়ার সৈয়দ শামসুল হক ঘরানার। কিন্তু আকাট শুদ্ধঅলারা এই ব্যাপারও নিতে রাজি না। সরয়ার তার চরিত্রদের ভাষায় কথা বলতে ধরলে চ্যানেল থিকা তারে ছুইড়া ফেলায় দিব। মনে হয়।

ফলে এই এক্সপেরিমেন্ট দুইটা তলে চলতেছে। এক. রচিত চরিত্র “খিচুড়ি” ভাষায় কথা কয়; আর রচয়িতা নিজে প্রমিতে। দুই. রচিত চরিত্র শুদ্ধ বা খিচুড়ি যাই বলুক রচয়িতা কথা বলে “খিচুড়ি” ভাষায়। প্রথমটা মৌলিকও না বিপ্লবও না, দ্বিতীয়টা মৌলিক না হইলেও বিপ্লব।

৫.
যারা বাংলা রচনায় এই উপস্থাপন ধরছেন তারা বিপ্লবী। তাগো দেখাদেখি যারা এই লাইনে লিখবেন তারা বিপ্লবের অনুসারী। সমসাময়িক বিপ্লবীদের অনুসরণ করাটা কঠিন কাজ। ইগো থাকে, ইর্ষা থাকে, আমিও-পারতাম থাকে। এখন এই অনুসরণ করতে পারাটাই বড় বিপ্লব। যাগো মুখে এই গদ্য চালু আছেন, তারা, ভাইয়েরা, এই ভাষায় এখন লেখতে ধরতে পারেন। অন্যে লিখা ফেলছে তাই লিখতে না পারার কারণ নাই। প্রমিত লাইনেও আপনেগো আগেই অন্যরা লিখতে শুরু করছিলেন।

 

Leave a Reply