তর্কের যে নিয়ম প্রশ্নহীনভাবেই গ্রাহ্য তার বাইরের তর্ক

যার ভাত নাই তারে জল দাও!

 

jol-dao

এই ছবিটায় দেখলাম আমার ভিক্ষা দেয় কিন্তু নেয় না এমন বন্ধুরা বেশ লাইক দিতেছে। আমার খুব পছন্দ না এই ছবি। নানা কারণেই। একটা একটা কইরা বলি। সঙ্গে এই ছবির অনুষঙ্গ হিসাবে যেসব ছবি তোলা যাইতে পারতো তার কাল্পনিক বর্ণনা।

১. ছবিতে অভিভাবক ক্যামেরার বাইরে থাইকা শিশুছাত্রীটির মহিমা বৃদ্ধি করতেছেন। দৃশ্যত ফকিন্নি মানুষদেরে পানি দানের নাম কইরা মহিমা চুরি করতেছেন বড়লোক ক্যামেরাম্যান বা শিশুর অভিভাবক। এই ছবির ক্ষেত্রে হইতে পারে দুইজন একই ব্যক্তি। (অনুষঙ্গ দৃশ্য, কাল্পনিক: মেয়েটা গাড়ি থিকা রাস্তায় নামছে গরিবদের খালি বোতলে শিশির সম্প্রদান করবে বইলা। ক্যামেরা হাতে বাপমা কেউ একজন নামছে ছবি তোলার জন্যে। পানি নিতে বাধ্য করা হইছে বুড়ামিয়ারে। ছবি তোলার খাতিরে বৃদ্ধের বোতলের পানি ফেলাইয়া দিয়া খালি করা হইছে বোতল। এসব দৃশ্য কাল্পনিক; অন্য রকমও হইতে পারে ছবি তোলার প্রস্তুতি।)

২. ছোটলোকগো ভাতরুটিপয়সার চাইতে বিশুদ্ধ পানি পাওনের দৃশ্য দৃশ্যত বেশি উপস্থাপনময় এই ছবিতে। উন্নয়ন ঘরানার ছবিটা যে লাইফ স্টাইল প্রেসক্রাইব করতেছে তা গরিবদের করুণা করার মাধ্যমে মহত্ত অর্জনের আপাত উদার মূলত হ্যাংলাপনার লাইফ স্টাইফ।

৩. গরিবরা যে ফ্রি পাইলে পানিও ভিক্ষা নেয় তা এই ছবিতে দেখানো হইতেছে, এইভাবে গরিবদের মর্যাদাহীন করুণার সঙ্গে উপস্থাপন করাটা মধ্যবিত্ত ফটোগ্রাফারদের প্রায় বিকল্পহীন স্বাভাবিকতা। তারা পাঠশালাগুলিতে এইভাবেই ছবি তুলতে শিখে থাকে।

এ ঘরানার ছবিতে গরিবের খেলা, গরিবের আনন্দ উপস্থাপনেও একই লক্ষণ দেখা যায়–যে গরিবেও খেলে! গরিবেও মজা করে!

৪. বৃদ্ধটি শিশুটির কাছে পানি চাইছেন তেমন মনে হয় না ছবি দেইখা। তাতে এই জলদান অযাচিত হয়। ভিক্ষা হিসাবে পানি সহজলভ্য। অনেক ভিক্ষুক বা গরিব আছে যারা দোকান থিকা, মসজিদ থিকা, বন্ধ হয় না এমন ওয়াসা থিকা সহজেই পানি পাইয়া থাকে। যা গরিবের বিনা পয়সার সম্পত্তি তাই তারে দান করার মাধ্যমে প্রত্যেকের তরে প্রত্যেকে আমরা মার্কা পারস্পরিকতা বিকশিত করার অপচেষ্টা হইছে এই ছবিতে। ছবির প্রতিপাদ্য সামাজিক অসাম্য বিষয়ে বড়লোক শিশুর সচেতনতা! হাঃ হাঃ।
(বিকল্প দৃশ্য: মেয়েটা গাড়িতে কইরা যাইতে ছিল, বৃদ্ধ বোতলে পানি না থাকায় মেয়েটার কাছে পানি ভিক্ষা চাইছেন। তখন গাড়ি থামাইয়া নাইমা আ্রইসা মেয়েটা পানি দিতেছে!)

৫. কিন্তু এ ঘটনা যে পারস্পরিকতা না তা বোঝা যাবে যদি ছোটলোকগুলা এখনই অর্জিত পানির পুরাটা না নিয়া ফিরতি মহত্ত দেখাইতে গিয়া ওদের নোংরা বোতলে ঢুইকা পড়া ওয়াটারের কিছু ওয়াটার শিশুর বটলে ফিরত দিতে যায়! কী ঘটতে পারে তাইলে:

ক) ক্যামেরায় সে ছবি ধারণ করা হবে উদ্ভটত্বের কারণে। মহ্ত্ত তাতেও প্রযুক্ত হইতে পারে। তাতেও দেখানো যাবে প্রত্যেকের তরে প্রত্যেকে আমরা। যে কারণে এই ছবি মহৎ ছবি নয় সে ছবিও মহৎ হবে না।

খ) শিশুটি তার পরিবার, টিভি ও বিদ্যালয়ে প্রাপ্য হাইজিন জ্ঞানও ভিক্ষা দিয়া যাবে ছোটলোক দুইটারে। তাতে ছোটলোকগুলা বুঝতে পারবে কেন পানি কেবল বিশুদ্ধ বটল থিকা দূষিত বোতলে যাবে!

গ) বাচ্চার অভিভাবক তথা ক্যামেরাবাজ একে ফরটি সেভেন দিয়া শুট কইরা বুড়াবুড়ির ভবলীলা সাঙ্গ কইরা দিবে, তাতে সলিল সমাধি ঘটবে ভাতহীন পানিময় বাংলার ফকিন্নিদের।

নীতিকথা: না চাহিলে জলদান করিবে না। সে ফারাক্কার আটকা জলই হউক আর তোমার আপন বোতলের বিশুদ্ধ খাইবার জলই হউক!

১৫/৫/১৩

 

1 Comment

Add Yours →

অসাধারণ ! কথাগুলাও আমিও বলতে চাইছিলাম ! কিন্তু বিভিন্ন কারণে বলি নাই ! 
ছুডু বেলা থেকেই নাকি অভ্যাস করাইতে হয় ! 
কাচায় না নোয়ালে বাঁশ ! পাকলে করে ঠাস ঠাস ! 
আমি তো ছুডু বেলায় পিস্তল লইয়া খেলতাম! তাইলে কি আমি সন্ত্রাসী ?? 
হালকা পাতলা ছবি আমিও তুলি ! এই ছবি পুরাই সাজানো গুছানো ! আমার কোনো সন্দেহই নাই ! 
এইটা বুজতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না !

Leave a Reply