পাঠ: “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে”

 

 

সব লোকে কয়

লালন কী জাত সংসারে

লালন বলে জাতের কী রূপ

দেখলাম না এ নজরে।।

 

সুন্নত দিলে হয় মুসলমান

নারী লোকের কী হয় বিধান

বামন চিনি পৈতা প্রমাণ

বামনি চিনি কিসে রে।।

 

কেউ মালা কেউ তসবি গলে

তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে

আসা কিংবা যাওয়ার কালে

জাতের চিহ্ন রয় কি রে।।

 

জগৎ বেড়ে জাতের কথা

গৌরব করি যথাতথা

লালন বলে জাতের ফাতা

বিকাইছি সাধ-বাজারে।

 

লালনের গানের কথা থিকা লালনরে (১৭৭২-১৮৯০) একটু বোঝনের চেষ্টা করি। লালনের যাপনকারীদের কথা বাদ দিলাম আপাতত। তদুপরি লালনের জাত বা মাহাত্ম্য বাদ দিয়াই শুরু করতেছি। বিকজ, যদি গুরুত্ব আর মহত্ত্বই ধরতে হয় তাইলে তো জাত ধরায়ও সমস্যা নাই। সুতরাং আর আর অ-জাত, অ-কুলশীল, অ-মহৎ, অ-বৃহতের লগে যেমন যেমন লালনের লগেও তেমন তেমন, হ্যাঁ?

 

লালন স্যার কইলেন, “লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।”

 

তারপরেই উনি জাতের যে যে রূপ নজরে দেখতেছেন তা বলতেছেন: “কেউ মালা কেউ তসবিহ গলে” “সুন্নত দিলে হয় মুসলমান” “বামন চিনি পৈতে প্রমাণ”।

 

লালন এই প্রকারে মোটা গলায় জাতরে আইডেনটিফাই করতেছেন। কিন্তু সুন্নত না দিলে নারীকে “মুসলমান” বলে বুঝতে চাইতেছেন না। বা বলতেছেন, “বামন চিনি পৈতে প্রমাণ বামনি চিনি কী প্রকারে”।

 

পৈতে না থাকলে বামনিকেও আর বামনি বইলা চেনার জো নাই। আদতে কি তাই? বর্গের মধ্যে বসবাসকারীর আরো বহু চিহ্নই তো আছে। তা লালনের নজরে যে পড়ছে তার চিহ্নও লালন তার গানে গানে রাইখা গেছেন।

 

জাত নয়, জাতের প্রকাশিত চিহ্ন নিয়া এই গান। ধরি, মালা, তসবিহ, পৈতা খুইলা (সুন্নতের কথায় আগাইলাম না, শুনছি ইহুদি জাতের ভাইরা আর আফ্রিকার কোন জাতের বইনরাও নাকি সুন্নত নেন; এনারা সুন্নতের দিক থিকা এক হইয়াও লালনের জাতের সমস্যা মিটাইতে পারেন নাই।) দেখতে শুনতে একান্তই বিনা জাত হওয়া গেল! তাতে কি জাত চইলা যাবে? জাত কি আর কেবল চিহ্নে থাকে গো?

 

তাই লালনের এই গান যতটা না জাত-অজাতের বিরোধ মিটাইতে চায় তার চেয়ে বেশি সকল জাতের প্রতি সেক্যুলার বিরোধিতার জয়গান গায়।

 

লালন বলতেছেন, “আসা কিংবা যাওয়ার কালে জাতের চিহ্ন রয় কি রে।”  বস্তুত, যাওয়া আসার সকল সময়ই জাতের সকল চিহ্নই মানব দেহরে ধারণ করতে হয়। গানের খাতিরে এই সব ব্যাপার অস্বীকার করা যাইতে পারে মনে হয়।

 

অন্য জাতের ভেদ বা পার্থক্যের প্রতি শ্রদ্ধা বা মাইনা নেওয়ার মধ্যেই জাতের সমস্যার সমাধান আছে। সকল জাতের ভেদ মিটাইয়া চিহ্নহীন কৃষ্টিহীন হওয়ার মধ্যে সেক্যুলার হওয়ার বা আধুনিক খৃষ্টান বা আধুনিক মানুষ হওয়ার বাইরে আর কী কী হওয়ার আছে? বরং “জাতের ফাতা বিকাইছি সাধ-বাজারে” বলার মধ্যে এক ফ্যাসিবাদী নাস্তিকতার দেখা মেলে। সব জাতের চিহ্ন ঘুচাইয়া দেওয়ার আহবানকারী লালনের নিজের লোকরা লালনের মতোই তাদের জাতিচিহ্ন তো ধইরাই আছেন এখনতরি। তাদেরে সাধুবাদ। তারা লালনের গানরে সেক্যুলারদের মতো ইতর বস্তুবাদিতায় পাঠ করেন না হয়তো। নাইলে খিলকা পইরা পরে বামনের পৈতা আর মুসলমানের তসবিহ ছাড়নের কথা বলা যাইতো না।

 

আমি মনে করি অত্যাচারী হিন্দু আর অত্যাচারী মুসলমানের কবল থিকা বাঁচনের জন্য সেই কালে লালনের এই গানের একটা নিরাপত্তাগত সামাজিক মূল্য আছিল। এই কালে অত্যাচারী খৃষ্টান আর ইহুদিদের হাত থিকা রক্ষা পাইতে হইলে নিপীড়িত মুসলমানের তসবিহ ছাড়াটা কাজের কাজ হবে না। হিন্দুর লগে ইহুদির যেহেতু সামরিক বন্ধুত্ব সাধন হইছেই ওনারা পৈতা আর না পরলেও পারবেন! জয় গুরু।

২৬ নভেম্বর ২০১০

 

২.

“কিন্তু এই গানের যে জীবন জিজ্ঞাসা, সেটার সামাজিক মূল্য নাস্তিকের নিরাপত্তার বাইরে কি নাই?”
Ashique Rupam Mahmood

 

এই গানে জীবন জিজ্ঞাসা যা সেইটা তো একটা ভ্রান্ত জীবনোপলব্ধির উপরে বহাল আছে। আমার পাঠের বেশিরভাগটায় আমি তাই বলছি।

প্রথমত জাতের রূপ যা দেখতেছেন তারে জাতের কারণ হিসাবে মানতে নারাজ লালন। কীভাবে? “লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।” মানে ভদ্রলোক যা জাতের বিভাজন চিহ্ন হিসাবে দেখতেছেন (যেমন কারো তসবিহ কারো মালা কারো সুন্নত কারো পৈতা কারো এগুলা নাই ইত্যাদি) তারে বিভাজনের যুক্তি হিসাবে মানতে নারাজ তিনি। ছেদো কারণটি লালনের গানে এই প্রকারে:

 

”সুন্নত দিলে হয় মুসলমান

নারী লোকের কী হয় বিধান

বামন চিনি পৈতা প্রমাণ

বামনি চিনি কিসে রে।।

 

কেউ মালা কেউ তসবি গলে

তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে

আসা কিংবা যাওয়ার কালে

জাতের চিহ্ন রয় কি রে।।”

 

লালন জন্মচিহ্নের বা জন্ম সময়ের চিহ্নের বাইরে সাংস্কৃতিক জাতবিচাররে অস্বীকার করতে চান। জন্মচিহ্ন নিয়া পরে বলতেছি… না থাউক, এখনই বলি। লালন জন্মের বাইরের জাতচিহ্নরে গোনায় ধরেন না, এই গানে। সাধবাজারে বেইচা ফালান। আবার জন্মচিহ্নগুলারেও গানে সামনে আনেন না। নৃবিজ্ঞানীরা তা আনেন।

জন্ম মাত্রই গ্রহণকারী নরচিহ্নের বিবিধ বৈচিত্র বা জাতচিহ্ন বহন করে। মানবজাতির যেই যেই বর্গে বা জাতে জন্মগ্রহণ করে শিশু সে সে জাতের চিহ্ন সে বহন করে। জাতে যখন শংকরায়ন ঘটে সে চিহ্নও আসা কিংবা যাওয়ার কালে রয় বটে!

 

যে জাতপাতের বিশিষ্টরা অন্য জাতের সঙ্গে নিজের জাতের পার্থক্য বাঙ্ময় রাখবে সে নিজের জাতের মধ্যেও পার্থক্য বা বিভাজন হাজির রাখবে এইটাই তো স্বাভাবিক। কারণ পার্থক্য বা শ্রেষ্ঠত্ব বা ভালো মন্দের বিচার সে তার মত কইরা করতে শিখছে। জগতের সকল প্রাণী সমান বলার মত ইশ্বরকণ্ঠ সে দখল করে না। সে নিজের দেখার ভিত্তিতে কথা বলে। বিচারের ভার সে নেয় না।

 

পক্ষান্তরে লালন সকল জাতের অবিমিশ্রতার বা বা আদৌ জাতের অনুপস্থিতির কথা কন। এইটা সেই `প্রথমত আমি মানুষ’ বলার মত ঘটনা। যদি প্রথমত নিজেরে মানুষ বলতে হয় তাইলে মানুষই বা বলবেন কী প্রকারে। আরো উচ্চতর জীবশ্রেণিবিভাজনের কাতারে গেলে আপনি তো আর মানুষও থাকেন না। কিন্তু লালন মানুষ হওয়া পরের ব্যাপার, নিজের জাতের বিশিষ্টতারেও হারান না। তারা দেহতত্ত্ববাদী থাকেন। বাউল থাকেন। খিলকা পরেন। আরো নানা আচারে বিরাজ করেন। এইটারে আমি ভ্রান্ত জীবনোপলব্ধি বলতে চাই।

 

এর বাইরে জাতের যা চিহ্নরূপা অর্থাৎ যে বিভাজন বা পার্থক্যই জাতের কীর্তি ধারণ করে অর্থাৎ জাতের যে সাংস্কৃতিক বহুরূপতার কারণে মুসলমানের পুরুষ জাতি সুন্নত নেয় ও নারী জাতের নিতে হয় না, বা যে আন্তঃ জাতপার্থক্যের কারণে বামন পৈতা নেয় কিন্তু বামনি নেয় না সেই পার্থক্যরেই একাকার করতে চান লালন। নিজেদের ভিতরকার এই পার্থক্য যদি ঘুচাইতেই রাজি থাকতো জাতওয়ালারা তাইলে তো তারা অগ্রে বিবেচ্য অন্য জাতির সঙ্গে পার্থক্যই ঘুচাইয়া দিত আগে আগে।

 

আরো সহজ করি, জাতঅলাদের নিজেদের মধ্যেকার সাংস্কৃতিক বা চিহ্নসংক্রান্ত পার্থক্য অগ্রবিবেচ্য নয়। অগ্রবিবেচ্য অন্য জাতের সঙ্গে তাদের পার্থক্য। যারা অন্য জাতের সঙ্গে পার্থক্য বহাল রাখে তারা জাতের মধ্যেও হাজারটা পার্থক্য রাখার জন্য সমালোচিত হইতে পারে না। কিন্তু লালন তেমন দুর্বল অভিযোগই করতেছেন “সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারী লোকের কী হয় বিধান/বামন চিনি পৈতা প্রমাণ/বামনি চিনি কিসে রে” বলার মধ্য দিয়া।

 

যাদের অন্য জাতের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নাই তাদের নিজের জাত থাকার কথাও নাই, ফলে নিজের জাতের ভেতরে কোনো পার্থক্য তারা রাখতে পারে না, বস্তুত তাদের নিজের তো কোনো জাতই নাই। তো লালন যে দেহতত্ত্ববাদী, যা তার জীবনোপলব্ধিরও প্রকাশ তার এই গান তো সেই জীবনোপলব্ধিরে পাশ কাটাইয়া গীত হইয়া থাকে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এমন উল্টাপাল্টা গান গাওয়াটা দোষের না মোটেই।

 

২৬/১১/২০১০ – ১২/১২/২০১০

 


1 Comment

Add Yours →

Leave a Reply